Skip to content

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি । সামাজিক ও রাজনৈতিক সমর্থন

ডিসেম্বর 2, 2012

১৩ জানুয়ারি বেগম সুফিয়া কামালের সাথে বৈঠকের সাথে পর এটা বোঝা গিয়েছিল যে তিনি একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সমর্থন দিচ্ছেন,শুধু শারীরিক কারনেই তিনি স্বয়ংসক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকতে পারছেন না। তারপর থেকেই নিয়মিতভাবেই বৈঠক হত। কোন কোন দিন একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হত।


কয়েকজন নেত্রীর সাথে আলোচনারত

ততদিনে সংঘঠিত হওয়ার একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির হয়ে গেল। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচারের দাবিতে বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু হল। এতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল।

১৯ জানুয়ারি একটি সভায় জাহানারা ইমাম সহ অন্যরা মিলিত হয়ে গঠন করেন ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’। ইতিপূর্বে যে সকল স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল সেই স্বাক্ষরদাতাদের ১০১জন হলেন এই কমিটির সদস্য আর জাহানারা ইমাম হলেন আহবায়ক। ২০ জানুয়ারি প্রায় সবকয়টি দৈনিকে এই কমিটি গঠনের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এরই মধ্যে শাহরিয়ার কবির সকলের বক্তব্যকে একসূত্রে গেঁথে একটি ঘোষণাও রচনা করে ফেলেছিলেন। তীক্ষ্ণ ও খুবই দৃঢ় এই ঘোষণার প্রথম স্তবকে বলা হল, ‘‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংঘঠিত মানবেতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যাযজ্ঞের প্রধান দোসর,অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীর দল জামাতে ইসলামী সম্প্রতি পাকিস্তানী নাগরিক গোলাম আজমকে তাদের আমীর বানিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আক্রমণ চালিয়েছে। এই গোলাম আজম একাত্তরেও জামাতে ইসলামীর আমীর ছিল। বর্বর পাকিস্তানী সৈন্যরা যখন সারা দেশ জুড়ে নির্বিচারে নিরস্ত্র জনসাধারণকে হত্যা করেছে, নির্যাতন করেছে আমাদের মা-বোনদের, তখন গোলাম আজম ও তার দল জামাতে ইসলামী শুধু তাদের অকুণ্ঠ সমর্থনই জানায় নি, নিজেরা উদ্যোগী হয়ে তাদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে একই ধরণের অপরাধ করেছে। কুখ্যাত পাকিস্তানী জেনারেল রাও ফরমান আলীর সঙ্গে বসে এই গোলাম আজম ঘাতক আলবদর বাহিনী তৈরি করেছিল এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম থেকে গোলাম আজম তার বিরোধিতা করেছে। বলেছে, ‘কোন ভালো মুসলমানই বাংলাদেশ আন্দোলনের সমর্থক হতে পারে না।’ মুক্তিযোদ্ধাদের তারা বলেছে, ‘দুষ্কৃতিকারী’, ‘জারজ সন্তান’ আর নিজেদের বলেছে ‘পাকিস্তান প্রেমিক’। এই পাকিস্তান প্রেমের কারনে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও গোলাম আজম বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে পাকিস্তানে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে। ১৯৭৮ সালে অসুস্থ মাকে দেখার অজুহাতে পাকিস্তানের একান্ত অনুগত নাগরিক গোলাম আজম বাংলাদেশে এসে একাত্তরের হিংস্র থাবা বিস্তার করেছে জামাতে ইসলামকে পুনর্গঠিত করার মাধ্যমে। একাত্তরের ঘাতকদের ঐক্যবদ্ধ করে’৮১ সালের ২৯ মার্চ প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে তারা সদম্ভে ঘোষণা করেছে-‘১৯৭১ সালে আমরা যা করেছি ঠিকই করেছি এবং একাত্তরে বাংলাদেশের কনসেপ্ট ঠিক ছিল না’। এই কথা বলে তারা অবিরাম হামলা চালিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির উপর। গত বারো বছরে তারা শত শত ছাত্র,মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক কর্মীকে হত্যা করেছে। কাউকে কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে,কাউকে পাথর দিয়ে মাথা গুঁড়িয়ে,কাউকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, কারো হাত ও পায়ের রগ কেটে দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকাদের পর্যন্ত শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে এবং এসব তারা করেছে ইসলামের দোহাই দিয়ে।’’

এই ঘোষণার শেষ স্তবকে স্পষ্ট বাক্যে উচ্চারিত হল একটি কর্মসূচিঃ ‘‘আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ২১তম বার্ষিকীর দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশিষ্ট নাগরিক ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত প্রকাশ্য গণআদালতে গোলাম আজমের বিচার হবে।’’

একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ধর্মীয় স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে। জাহানারা ইমাম বলেন, ‘‘দেশবাসী জানে ঘাতক গোলাম আজমের দল জামাত-শিবির খুবই সংঘঠিত ও শক্তিশালী। তারা গত বিশ একুশ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল বিভিন্ন সরকারের কাছ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছে। টাকা পাচ্ছে অজস্র, অগণিত টাকা। নানা ধরণের ব্যাবসা পাচ্ছে, বাণিজ্য করছে। আমরা জানতে পেরেছি তারা অস্ত্রও আনছে। তারা গোপন সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলছে। দেশের কিছু জায়গায় বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তারা গোপন ঘাঁটি গড়ে তুলছে, যেখানে তাদের ক্যাডারদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষন দেয়া হয়। মোটের ওপর জামাত-শিবির একটি ফ্যাসিবাদী ঘাতক সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে উঠেছে-যা এক ভয়াবহ ধর্মীয় স্বৈরাচার’’।
তিনি আরও বলেন, ‘‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল শক্তি এক না হলে এই কঠিন বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে না। আমাদের মধ্যে যতই মত পার্থক্য থাকুক না কেন, ধর্মীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ ঐক্যমত থাকতে হবে। এটা তো খুবই সাধারণ কথা, সবাইকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলতে হয়। গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল শক্তি যদি এই প্রশ্নে এক না হতে পারে তাহলে তারা আমাদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে-হত্যা করবে। তাদের নিষ্ঠুর, নির্মম, বর্বর চেহারা তো আমরা এই সেদিনও দেখেছি-একাত্তরে। তাছাড়া একাত্তরে যারা শিশু-কিশোর ছিল এবং যাদের জন্ম একাত্তর-পরবর্তী সময়ে তারা তো গত বারো বছর দেখেছে জামাত-শিবির চক্রের পাশবিক মুখচ্ছবি’’।

ঠিক করা হল শুধু এই কারনেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল রাজনৈতিক দল ও শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে যাওয়া হবে। কথা বলা হবে সবার সাথে। জানানো হবে দেশ নিয়ে উদ্বেগের কথা,জানাতে হবে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উদ্যোগের কথা। একাত্তরের ঘাতক-দালালদের প্রতিরোধের কার্যকর পথ বের করতে হবে এই ভাবনা থেকে একদিন জাহানারা ইমাম,কর্ণেল কাজী নূরুজ্জামানসহ চার-পাঁচ জন সংসদ ভবনে গেলেন। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সাথে কথা বলার জন্য। শেখ হাসিনা ছিলেন না,তিনি তার ছোটবোন শেখ রেহানার অসুস্থ স্বামীকে দেখতে সিঙ্গাপুর গিয়েছিলেন। তারা কথা বললেন আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্যদের সাথে। একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁদের জানানো হল,তাঁরাও তাঁদের মতামত জানালেন। ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিতে তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে আব্দুর রাজ্জাককে যুক্ত করে দেয়া হল। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বী রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও সামাজিক সংঘঠনের প্রতিনিধিরা বেশ ভালোভাবেই ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সাথে একাত্ম হতে লাগল। এ যেন একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া।

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী চক্র প্রতিরোধ মঞ্চ’ নামে একটি সংঘঠন গড়ে ওঠার খবর আসল ২৪ জানুয়ারি। সেখানেও ছিল রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী সহ ১০১ জনের নাম। ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির বৈঠকে জাহানারা ইমাম ঠিক করলেন এই সংঘঠনের সাথে একসাথে কাজ করা হবে। অন্যদিকে প্রায় সকল ছাত্র সংঘঠন সংবাদপত্রে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। ছাত্র নেতাদের সাথে যোগাযোগ করা হল ‘প্রতিরোধ মঞ্চ’এর সাহায্যে। ৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রনেতাদের সঙ্গে ৩৩ তোপখানা রোডের ব্যাপক বিস্তৃত আলোচনার পর ৬ ফেব্রুয়ারি কর্নেল তাহের মিলনায়তনে ছাত্রদের আহ্বানে একটি মতবিনিময় সভার সিদ্ধান্ত হল। ৬ তারিখ যথারীতি অনুষ্ঠিত হল সেই সভা।


মতবিনিময় সভা

সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন নাজমুল হক। জাহানারা ইমামকে কিছু বলতে বললে তিনি শুধু বললেন, ‘‘আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে নামতে হবে এবং তা না পারলে আমরা বাঁচতে পারব না। এদেশের নতুন প্রজন্মের সামনে অপেক্ষা করছে এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ।’’

Advertisements
মন্তব্য করুন

কিছু বলেন...

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: